মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দূর্নীতি করে কোটি টাকা আত্মসাথের অভিযোগ দুদক-পত্রে উঠেছে।
গত ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে এমএসআর সামগ্রী ক্রয় না করে পুরাতন গুলো রং করে বিল উত্তোলনের কথা দুদুক-এর দায়েরকৃত পত্রে উল্লেখ রয়েছে। অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে,একই ভাবে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে পরিছন্ন ও মনিহারী ক্রয় দেখিয়েও টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে আরো কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের অনিয়ম,দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে স্থানীয় জনসাধারণের পক্ষে মো: আমীর হামজা পিন্টু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন এবং ৪টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়,স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়,মহা-পরিচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর,চেয়ারম্যান-দূর্নীতি দমন কমিশন) অনুলিপি দেন। ওই লিখিত অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত তত্ত্বাবধায়কের শাস্তির দাবিও করা হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দূনীতি,জাল কাগজ বানিয়ে পছন্দের ঠিকাদার সাজনিন এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দিয়ে অফিসের গিয়াস উদ্দিনকে দিয়ে সকল প্রকার মালামাল ক্রয় করে অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে দুদুকের ওই লিখিত অভিযোগ পত্রে । অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা সেবা চরম ভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলেও ওই পত্রে জানা যায়। এমনকি ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকারীদের চিকিৎসায় বাঁধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেবার মান ভেঙে পড়ায় চলতি বছরের গত (৭ অক্টোবর) ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সরেজমিন নথিপত্রের অনুসন্ধানে জানা যায়, মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে কেনা হয়েছে কোটি টাকার প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে হাসপাতালের বিভিন্ন মালামাল ও সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুদকের লিখিত ওই পত্রের সংযুক্তি বিশ্লেষণে। টেন্ডার পত্রের তথ্যের সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন আকার ও রঙ্গের বিন (ময়লা ফেলার পাত্র) কথা উল্লেখ থাকলেও হাসপাতালে সরেজমিনে বিনের সংখ্যা অনেক কম। অথচ ওই টেন্ডারের বিন বাবদ ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫০ টাকার কথা ওই অভিযোগ পত্রের সংযুক্তি বিশ্লেষণে তা জানা যায়।
একই সংযুক্তিতে আরো উল্লেখ আছে, ১৭৫০ ভিএ (VA) ক্ষমতার আইপিএস ও ফুল সেট ফিটিংস বাবদ ৩ লাখ ৭১ হাজার ২৫০ টাকা এবং হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন আকারের রেফ্রিজারেটর ক্রয় বাবদ ১৮ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা । ১০টি বিভিন্ন ক্ষমতার স্প্লিট এসি (Split AC) ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ঘাস কাটার মেশিন ও ফটোকপি মেশিন ক্রয়ের জন্য ২১ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে,বিগত ২(দুই) অর্থ বছরের বাজার দরের থেকে কয়েক গুন বেশি দাম দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক তার পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে অর্থ আত্মাসাৎ করেছেন। এমন তথ্য দুদকের ওই অভিযোগ পত্রের সংযুক্তি বিশ্লেষণে দেখা যায়।
তবে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে এই বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক কোন তথ্য দিতে নারাজ। পরে তিনি লিখিত (তথ্য অধিকার আইনে) ভাবে আবেদনের কথা বলেন এবং কোন কোন বিষয়ে তথ্য দেওয়া যাবে না, সে কথাও উল্লেখ করেন।
অপর দিকে, নথিপত্রের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতের বিপরীতে বিশাল অংকের বাজেট বরাদ্দ ও বিল প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ওষুধ খাতে (বাজেট কোড নং- ৩২৫২১০৯) ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং কেমিক্যাল ও রি-এজেন্ট খাতে (বাজেট কোড নং- ৩২৫২১১০) ১ কোটি ৭৮ লাখ ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং স্ট্যাম্প ও সিল (বাজেট কোড নং ৩২৫৫১০৪) ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫০০ টাকার বিল দেখানো হয়েছে।
বাজেটে অন্যান্য মনোহারী খাতে (বাজেট কোড নং- ৩২৫৫১০৫) ৭২ লাখ ৭০ হাজার ১০০ টাকা এবং পরিচ্ছন্নতা খাতে (বাজেট কোড নং- ৩২১১১০২) ৯৭ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকার বিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি মোটরযান মেরামত খাতে (বাজেট কোড নং- ৩২৫৮১০১) ৭ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ টাকার বিল দেখানো হয়।
প্রতিটি বরাদ্দের অর্থের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১০ কোটি ৪৬ লাখ ৮ হাজার ৯৭৪ টাকার এক বিশাল বিল তৈরি করা হয়েছে। এরি মধ্যে বেশ কিছু অর্থ উত্তোলনও করা হয় । প্রকৃত অর্থে কতটা কার্যকরী বা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দুদকে লিখিত অভিযোগকারী আমীর হামজা পিন্টু বলেন, হাসপাতালের বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক ডা. বাহাউদ্দীন দীর্ঘ দিন ধরে নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনের সময় তিনি আহতদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে বাঁধাসহ হাসপাতালের মূল গেইট তার নির্দেশে বন্ধ করে দিয়ে ছিলো, যা জেলার সব মানুষ জানেন। অবৈধ ভাবে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে সেখান থেকে অর্থ লোপাট করতে সহায়তা করেছেন। আমি তাঁর এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায়,আমাকে মানসিক ভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। আমি জনস্বার্থে তাঁর অপকর্মের প্রামাণিক দলিলসহ দুদকে অভিযোগ দায়ের করেছি। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মেসার্স সাজনিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মিলন হোসেন বলেন,ই-জিপিতে কোন কাগজপত্র টেম্পারিং করে আবেদন করার সুযোগ নাই। আপনার মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগের তথ্য শুনলাম তার কোনো ভিত্তি নেই।
নাম পরিচয় প্রকাশ না করার মর্মে একাধিক স্টাফ বলেন, আমাদের তত্ত্বাবধায়ক স্যারের বিরুদ্ধে যতই দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হোক না কেন তাতে তাঁর কিছুই হবে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে ম্যানেজ করেই তিনি এখানে দায়িত্ব পালন করছেন। আপনারা তো জানেনই কি-ভাবে এবং কি দিয়ে সবকিছু ম্যানেজ করতে হয়। তাই স্যারের কোনো কিছুই করতে পারবেন না। তিনি এখান থেকেই পদোন্নতি নিয়ে তবেই যাবেন।
দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মানিকগঞ্জ জজকোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর( পিপি) দেওয়ান মো: মিজানুর রহমান বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে যে কোনো ব্যক্তি দুদুকের হটলাইন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে দুর্নীতি বিরোধী অভিযোগ জানাতে পারেন। প্রাথমিক সত্যতা মিললে দুদক তদন্ত সাপেক্ষে মামলা দায়ের, আসামিকে গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি বিচারের জন্য বিশেষ জজ আদালতে প্রেরণ করেন।
মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: বাহাউদ্দীন বলেন, উত্থাপিত অভিযোগ সমূহ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
অভিযোগপত্রে যে অর্থ বছরের কথা উল্লেখ রয়েছে,সেটির বিল বা ওয়ার্কশিট পাওয়া যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তথ্য পেতে হলে অফিশিয়ালি বা দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হবে। তবে দাপ্তরিক ভাবে আবেদন করলেই কাঙ্ক্ষিত তথ্য পাওয়া যাবে কি না,সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট ধারণা দেন। তথ্য অধিকার আইনের বিধান উল্লেখ করে তিনি জানান, আইন অনুযায়ী কোন কোন তথ্য প্রকাশ যোগ্য এবং কোন বিষয় গুলো গোপনীয়,তা সরবরাহ যোগ্য নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন,মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ ক্রয়ে কোটি টাকার ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুদকে অভিযোগসহ সংশ্লিষ্ট ৪টি কার্যালয়ে অনুলিপি দেওয়া হয়েছে এমন কথাও শুনছি। এই অনিয়মের সাথে জড়িত মূল ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তথ্য অধিকার আইনের অপব্যবহার করে হাসপাতালের দুর্নীতি ও অপরাধ আড়াল করার অপচেষ্টা চালানো কোনো ভাবেই গ্রহণ যোগ্য নয়। স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষার জন্য কেনা রাষ্টের অর্থে অপচয় রোধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।









