শিরোনাম
Advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

​৫২ কোটির জলাঞ্জলি: মানিকগঞ্জের শতবর্ষী খাল এখন শহরবাসীর বিষফোঁড়া

Advertisement
কালো পানি, দুর্গন্ধ, মানিকগঞ্জের এই খাল শহরবাসীর বিষফোঁড়াছবি: সারাক্ষণ সংবাদ

তিন দফায় ৫২ কোটি টাকারও বেশি সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংস্কার হয়নি মানিকগঞ্জের ঐতিহাসিক ‘শহর খালটি’। ফলে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পৌরবাসী।

চরম অনিয়ম,পৌরসভার তদারকিহীনতা এবং পানিপ্রবাহে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই খালটি এখন বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে; যা শহরবাসীর জন্য এক চরম দুর্ভোগের কারণ।

​স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংস্কার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও নাগরিক সুবিধা মিলেনি।

পৌর কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে সংস্কার কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়নি বলে তাদের দাবি।

বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ, ৫২ কোটি জলে মশার বংশ বৃদ্ধি
বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ, ৫২ কোটি জলে মশার বংশ বৃদ্ধিছবি: সারাক্ষণ সংবাদ
 
গত দেড় যুগে যারাই পৌরসভার দায়িত্বে এসেছেন, তারাই এই খাল সংস্কার নিয়ে রাজনীতি করেছেন বলে মনে করেন ক্ষুব্ধ নগরবাসী।

​খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭২ সালে মানিকগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৭ সালে এটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। তবে কাগজে-কলমে প্রথম শ্রেণি হলেও বাস্তব চিত্রে তার প্রতিফলন নেই। তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে জেলা শহরের জলনিষ্কাশন ও নৌযোগাযোগের সুবিধার্থে শহরের মধ্য দিয়ে প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি খনন করা হয়েছিল।

কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গে যুক্ত এই খাল দিয়ে এক সময় অনায়াসে পণ্যবাহী নৌকা চলাচল করত। পুরো বছর পানিপ্রবাহ থাকা শত বছরের পুরোনো এই খালের পানি নানা কাজে ব্যবহার করতেন স্থানীয়রা।

সংস্কারের নামে শুধু পাড় বাঁধাই, পানির বদলে মরা খাল কচুরিপানায় ভরা
সংস্কারের নামে শুধু পাড় বাঁধাই, পানির বদলে মরা খাল কচুরিপানায় ভরাছবি: সারাক্ষণ সংবাদ
 

কিন্তু কালের বিবর্তনে খালটি এখন শহরবাসীর চরম কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবির মুখে গত ১৯ বছরে মানিকগঞ্জ পৌরসভা কয়েক দফায় কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিলেও কোনো সুফল মেলেনি।

উল্টো সৌন্দর্যবর্ধনের নামে খালের দুই পাশে বাঁধ নির্মাণ করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা খালটিকে পুরোপুরি স্থবির করে ফেলেছে।

​মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খাল সংস্কারে এ পর্যন্ত তিন দফায় উদ্যোগ নেওয়া হয়:

​১. প্রথম দফা (২০০৭): ৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বান্দুটিয়া থেকে শুরুন্ডি পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার খালের দুই পাড়ে সিসি ব্লক বসানো হয় এবং পথচারীদের জন্য হাঁটার রাস্তা তৈরি করা হয়। তবে তদারকির অভাবে বছর না ঘুরতেই সিসি ব্লকগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং হাঁটার পথটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

​২. দ্বিতীয় দফা (২০০৮): এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিসি) সহায়তায় ১৮ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৭৭ টাকা ব্যয়ে কালীগঙ্গা নদীর সংযোগস্থল থেকে বকজুরি সেতু পর্যন্ত খাল খননের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি ও পৌরসভা। ১,৪৪০ মিটারে পুনরায় ব্লক বসানো হয় এবং কিছু অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়। তবে সংস্কারের মাত্র ছয় মাসের মাথায় খালটি আবারও বর্জ্যের স্তূপে পরিণত হয়।

(পরবর্তীতে ২০১৬ সালে টাউন লেভেল কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভায় খাল পরিষ্কার করে মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়।)

​৩. তৃতীয় দফা (২০২২): ২০২২ সালের ১৮ মে খাল পুনর্খনন, সৌন্দর্যবর্ধন, ৩টি সেতু ও ১টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৮ কোটি টাকা।

পরে ২৫ কোটি ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকার চুক্তিতে কাজটি যৌথভাবে পায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স।

২০২৪ সালের ১০ মে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে মেয়াদ ও খরচ বাড়িয়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৭ কোটি ৯৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৬ টাকা।

​তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে গেলে কাজ থমকে যায়।

পরবর্তীতে পৌরসভায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসক নিয়োগের পর কাজ পুনরায় শুরু হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, অত্যন্ত নিম্নমানের ব্লক ও জোড়াতালি দিয়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

​পরিবেশবিদদের মতে, যেকোনো খাল সংস্কারের প্রধান শর্তই হলো এর পানিপ্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা। খালের ওপর বা দুই পাশে এমন কোনো কাঠামো নির্মাণ করা উচিত নয় যা পানির গতিপথ রুদ্ধ করে। পাশাপাশি নিয়মিত কচুরিপানা ও বর্জ্য অপসারণ করে ড্রেন বা নালাগুলো সচল রাখা জরুরি।

​স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রাব্বি হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের নামে শুধু সরকারের টাকার অপচয়ই হয়েছে, খালের কোনো সৌন্দর্যই ফিরে আসেনি।

অপর বাসিন্দা তারিকুল হাসান বলেন,বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁর ময়লা ফেলে খালটিকে বিষাক্ত করা হচ্ছে। নোংরা পানিতে মশার উপদ্রব ও রোগজীবাণু ছড়িয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

খাল এখন শহরের ময়লার স্তূপ, নাগরিক দুর্ভোগ চরমে
খাল এখন শহরের ময়লার স্তূপ, নাগরিক দুর্ভোগ চরমেছবি: সারাক্ষণ সংবাদ
 

​সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস জানান, কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও তদারকির অভাবেই কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী খালটির আজ এই পরিণতি। চলমান কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

পৌরসভার নবনিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানান, তিনি সম্প্রতি যোগদান করেছেন। খালের প্রকল্পের সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারবেন। তবে যতটুকু জেনেছেন, কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ