শিরোনাম
Advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

সাটুরিয়ায় ৬ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র: কাগজে ডাক্তার,বাস্তবে শূন্য !

Advertisement
উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তালাবদ্ধ মেডিকেল অফিসারের কক্ষছবি: সারাক্ষণ সংবাদ

    মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পদায়িত চিকিৎসকরা ধীর্ঘ দিন যাবৎ অনুপস্থিত।

    ফলে প্রায় দেড় লাখ মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

    মেডিকেল অফিসারদের অনুপস্থিতিতে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও ফার্মাসিস্টদের দিয়ে হাসপাতাল চলায় মারাত্মক ভাবে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্য সেবার মান।

    এতে করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ তাঁদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

    উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায, বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ধানকোড়া, চরতিল্লি ও দ্বিমুখা উপ- স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসারগণ মূল কর্মস্থলে না গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী দেখেন।

    সাটুরিয়া উপজেলার একটি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র
    সাটুরিয়া উপজেলার একটি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রছবি: সারাক্ষণ সংবাদ
     

    তিল্লি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (এমআইএস) বিভাগে প্রাক্কলনে যুক্ত আছেন। দরগ্রাম উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে সংযুক্ত রযেছে।

    এছাড়া বালিয়াটি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পদটি বর্তমানে শূন্য।

    এসব উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পদায়ন থাকা সত্ত্বেও মূলত ফার্মাসিস্ট ও উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের দিয়েই চিকিৎসা সেবা পরিচালনা করা হচ্ছে।

    গত কয়েক দিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। উপজেলার প্রান্তিক স্বাস্থ্য সেবায় চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে।

    সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপজেলার ৬টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক কর্মরত আছেন কিন্তু বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। চিকিৎসকদের নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণে গ্রামীণ প্রান্তিক সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে চরম ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।

    স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইউনিয়ন পর্যায়ের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে একজন করে মেডিকেল অফিসার, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহকারী পদে নিয়োগ দিয়েছে।

    তবে বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো মেডিকেল অফিসার ৫/১০ বছরের মধ্যে কর্মস্থলে উপস্থিত হননি। ফলে অন্য কর্মীদের দিয়েই দায়-সারা ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

    প্রশাসনিক তদারকির অভাবে চিকিৎসকরা দায়িত্ব অবহেলা করে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকছেন। অন্য দিকে স্থানীয় অন্য কর্মীরা রোগীদের নির্দিষ্ট নামসর্বস্ব কোম্পানি’র ঔষধ ওই সকল ফার্মেসি থেকে কিনতে বাধ্য করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

    ফলে সঠিক সেবা না পেয়ে সাধারণ মানুষ সামান্য চিকিৎসার জন্যও জেলা উপজেলায় গিয়ে সময় ও অর্থের অপচয় করছে।ভুক্তভোগীরা দ্রুত উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে সঠিক সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

    চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে খালি পড়ে থাকা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ কক্ষ
    চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে খালি পড়ে থাকা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ কক্ষছবি: সারাক্ষণ সংবাদ
     
    উপজেলার দরগ্রাম উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার বিশ্বজিৎ সরকার জানান, দীর্ঘ ৯ বছরের কর্মজীবনে তিনি এই কেন্দ্রে কোনো এমবিবিএস চিকিৎসককে আসতে দেখি নি।

    বাধ্য হয়ে আমরা আগত রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এমবিবিএস চিকিৎসকদের রোগী দেখার সু-ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তারা আসেন না। যার ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

    ​একই বিষয়ে ধানকোড়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, গত তিন বছর ধরে সেখানে মেডিকেল অফিসারের কক্ষে তালা ঝুলছে। এমনকি বর্তমানে কোনো এমবিবিএস ডাক্তারের পদায়ন (পোস্টিং) আছে কি না, সে বিষয়েও আমরা অবগত নই।

    ​তিল্লী চরাঞ্চলের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, অসুখ-বিসুখ হলে গ্রামের হাসপাতালেই আসি। তারা ওষুধ দেন, তা নিয়ে চলে যাই। কে বড় ডাক্তার (এমবিবিএস) আর কে ছোট ডাক্তার তা-তো জানি না। আজ জানতে পারলাম এখানে বড় ডাক্তারের বসার কথা, কিন্তু তিনি আসেন না।

    ​ধানকোড়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা লতিফা খাতুন, আবুল বাশার ও দীপা নামের একাধিক রোগীর সাথে কথা হলে তারা জানান, অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। কর্মরত কর্মীরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেন বটে, তবে একজন এমবিবিএস ডাক্তার থাকলে তিনি সঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় করে ওষুধ লিখতে পারতেন। বর্তমানে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি কেবল একটি গল্প গুজবের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

    ​অন্য দিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে (এমবিবিএস) ডাক্তাররা রোগী দেখুক তা সেখানকার অনেকে চান না। কারণ বড় ডাক্তার রোগী দেখলে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের ব্যক্তিগত চেম্বার ও নিম্নমানের ওষুধ কোম্পানির ব্যবসায় ভাটা পড়বে। নিজেদের এই অনৈতিক আয় বজায় রাখার স্বার্থে এমবিবিএস ডাক্তারদের আগমন বাধাগ্রস্ত করতে অসৎ পন্থা অবলম্বন করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

    ​সাটুরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্রীড়াবিদ মিজানুর রহমান মিজান বলেন, প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের যে চাপ থাকে, তা কল্পনাও করা যায় না। উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে যদি সপ্তাহে অন্তত তিন দিনও চিকিৎসকেরা নিয়মিত রোগী দেখতেন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতো না। কিন্তু তা না করে অনেকেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

    উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (এমবিবিএস) চিকিৎসকেরা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

    ​সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ২৮ জন চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও উপজেলার ৬টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকেরা বসছেন না। অনেকেই সংযুক্তিতে (ডেপুটেশনে) কর্মরত আছেন।

    ডাক্তাররা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কেনো রোগী দেখছে না এমন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন,উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলো’র অবকাঠামো জরাজীর্ণ হওয়ায় সেখানে চিকিৎসকেরা গিয়ে রোগী দেখতে চান না।

    সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, গ্রামাঞ্চলের ইউনিয়নের স্বাস্থ্য সেবা আধুনিক ও শক্তিশালী করা গেলে ৭০-৮০ শতাংশ চিকিৎসা এখন থেকেই দেওয়া সম্ভব। যা শহরের বড় হাসপাতাল গুলোর ওপর চাপ কমাবে। এজন্য প্রতিটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এমবিবিএস চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ