ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জের বানিয়াজুরি থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা অংশের প্রতিটি পয়েন্টে অবাধে চলছে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার।
মহাসড়কে নছিমন, করিমন, ভটভটি, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের মতো অবৈধ যান চলাচল আইনগত ভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। প্রতিদিন হাইওয়ে থানার সামনে দিয়েই এসব যান নির্বিঘ্নে চলাচল করলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কেন এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মানিকগঞ্জ জেলায় দুটি হাইওয়ে থানা রয়েছে, যে গুলোর মূল দায়িত্ব মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা। সরকার ও উচ্চ আদালতের কড়া নির্দেশ রয়েছে, মহাসড়কে কোনো ভাবেই প্রাণঘাতী ও ধীরগতির থ্রি-হুইলার জাতীয় অবৈধ যানবাহন চলতে পারবে না।

অথচ বানিয়াজুরি থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা মহাসড়কে কোনো এক অজানা কারণে দূরপাল্লার যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। কেন এবং কীভাবে এগুলো চলাচল করছে, তা এখন ওপেন সিক্রেট এমন মন্তব্য করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
অন্য দিকে বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানা সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে ৪টি এবং নিয়মিত মামলা হয়েছে ৭টি। একই ভাবে আগস্ট মাসে ৩টি দুর্ঘটনা ও নিয়মিত ৪টি মামলা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট থানা এলাকায় যে হারে থ্রি-হুইলার চলাচল করে, তাতে প্রতি মাসে অন্তত শতাধিক বা তারও বেশি মামলা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে প্রতিনিয়তই সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অদৃশ্য ইন্ধন বা রহস্যজনক কারণে দাপিয়ে বেড়ানো এসব যানবাহন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মহাসড়কের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই যদি এগুলো বন্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেন, তবে কীভাবে দুর্ঘটনা কমবে এমন প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জোকা এলাকায় প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ইজিবাইকচালক মোবারক হোসেনের। গল্পের ছলে তিনি বলেন, প্রতিদিন এই মহাসড়ক দিয়ে বরঙ্গাইল থেকে বানিয়াজুরি পর্যন্ত আট/দশ বার ট্রিপ দিই। যাত্রীও ভালো পাই, আর আয়ও খারাপ হয় না। মহাসড়কে এই ছোট গাড়ি চালানোর কারণে পুলিশ কিছু বলে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব তো ‘সিস্টেমের’ মধ্যেই চলে,আমাদের সমিতি আছে, কোনো ঝামেলা হলে তারা দেখে। তা ছাড়া মহাসড়ক এলাকায় বরঙ্গাইল হাইওয়ে পুলিশের তেমন একটা দেখাও মেলে না।

বরঙ্গাইল এলাকার একটি সিএনজি স্টেশনে মতিন নামের এক চালক বলেন, সব কথা বলা যাবে না,তবে তাঁদের কথা না শুনলে মামলা খেতে হয়। যেহেতু আমরা মহাসড়ক ব্যবহার করব, সেহেতু আমাদের কিছু কথা তো শুনতেই হবে।
উথুলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একাধিক থ্রি-হুইলারের মালিক ও চালক বলেন, পুলিশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা যায়? অল্প একটু মহাসড়ক ব্যবহার করি, তার জন্য অনেক কিছু ম্যানেজ করেই গাড়ি চালাতে হয়। প্রতিবেদককে অনুরোধ করে তাঁরা আরও বলেন, আমাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করবেন না, তাহলে পেটে লাথি পড়বে।
বানিয়াজুরি বাসস্ট্যান্ডে প্রতিবেদকের কথা হয় পথচারী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাসস্ট্যান্ড গুলোতে আমাদের আঞ্চলিক,দূরপাল্লার বাসের পাশাপাশি থ্রি-হুইলার গুলো হুড়োহুড়ি শুরু করে দেয়। ওই সময়টাতে সাধারণ পথচারীরা বেশ বিরক্ত ও আতঙ্কিত থাকি,এই বুঝি শরীরের ওপর গাড়ি তুলে দেয়। মহাসড়কে যত্রতত্র অবাধে থ্রি-হুইলার চলাচলের কারণে প্রতিনিয়তই আমাদের ছোট বড় দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে।
সেলফি পরিবহনের চালক সৌরভ আহমেদ বলেন, আমাদের বাস গুলোতে প্রায় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে মহাসড়কে চলাচল করতে হয়। বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডের ফিডার রোড থেকে হঠাৎ করেই এই থ্রি-হুইলার গুলোর এলোপাতাড়ি চলাচলের কারণে আমাদের বেশ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
নীলাচল পরিবহনের অপর চালক আনিস মিয়া বলেন, আমাদের যানবাহন গুলো সব সময়ই একটি নির্দিষ্ট গতি সীমায় চলাচল করে। ইদানিং মহাসড়কে থ্রি-হুইলারের আনাগোনা অনেক বেড়ে গেছে এবং যত্রতত্র ব্রেক করে যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে আমাদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয়। মহাসড়কে বড় গাড়ি চলাচল করবে, সেখানে যেন এ ধরনের অবৈধ ইঞ্জিনচালিত থ্রি-হুইলার চলাচল করতে না পারে,এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর দৃষ্টি কামনা করছি।
বরঙ্গাইল হাইওয়ে সংলগ্ন সিএনজি মালিক সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতৃবৃন্দ বলেন, মহাসড়কে না উঠলে গ্যাস পাওয়া যায় না, তাই বাধ্য হয়েই সকালে আমাদের মহাসড়কে উঠতে হয়। তবে স্থানীয় যাত্রীরা আশপাশের এলাকায় যেতে চাইলে বড় গাড়ি গুলো সেখানে থামে না। এ কারণে আমরা জনসেবার উদ্দেশ্যে সড়কে গিয়ে যাত্রীদের উপকার করে থাকি। মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আরও বলেন, এ ধরনের কোনো আইনের কথা জানা নেই।
মানিকগঞ্জ জেলা বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস ও অটোটেম্পো ওনার্স গ্রুপের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক লিটন বলেন, মহাসড়কে দূরপাল্লার পরিবহনের পাশাপাশি আঞ্চলিক যানবাহন চলাচল করা স্বাভাবিক। তবে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে থ্রি-হুইলার চলাচলের কারণে বড় যানবাহনের চালকদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় থ্রি-হুইলারের এলোপাতাড়ি চলাচলের ফলে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এতে হতাহত হন থ্রি-হুইলারের চালক ও যাত্রীরা। কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কার দোষ, তা বিবেচনা না করে কেবল বড় যানবাহনের চালকদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মহাসড়কে এই ধরনের থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ করার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল সম্পূর্ণ অবৈধ ও প্রাণঘাতী। সুশাসনের অভাবেই সড়কে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ বিপন্ন। জনবল সংকট এমন মন্তব্য কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার হতে পারে না। দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা না গেলে ম্যানেজ হয়েছে এমন ধারণা করাটা কিন্তু স্বাভাবিক। সে জন্য আশা করব, দ্রুত মহাসড়ক নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মানিকগঞ্জ বিআরটিএ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মাহবুব কামাল বলেন, কোনো ভাবেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিংবা সিএনজি চালিত থ্রি-হুইলার মহাসড়কে চলতে পারবে না। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বর্তমানে মহাসড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে থ্রি-হুইলার চলাচল অনেকাংশেই বেড়ে গেছে। আমাদের নিয়মিত অভিযান আরও বাড়াতে হবে, তবেই মহাসড়ক থেকে এই অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ করা সম্ভব।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিষা রানী কর্মকার বলেন, বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশকে মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে। আমরা মাঝে মধ্যেই অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি।
বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশিদ বলেন, শুধু আমার এখানে না, সারাদেশের সব মহাসড়কেই তো থ্রি-হুইলার চলছে। নামমাত্র নিয়মিত মামলা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে জনবল সংকটের পুরোনো অজুহাত তুলে দায় এড়াতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, এগুলো তো আপনাদের কাজ, একই সঙ্গে গণমাধ্যমে তুলে ধরে সমাধানে ভূমিকা রাখবেন।





