শিরোনাম
Advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

ঘিওরে ১৫৩৬ একর খাসজমি, ভূমি অফিসে নেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য

Advertisement
ছবি: সংগৃহীত

    মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বড়টিয়া ইউনিয়নের ফুলহারা বাজারে প্রবাহিত ফুলহারা খাল। একসময় চার গ্রামের কৃষিজমির পানি নিষ্কাশন ও সেচের অন্যতম ভরসা ছিল এই খাল।

    এখন সেই খালের বুকেই পড়ছে মাটি বালু। কোথাও উঠছে দোকানঘর, কোথাও স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থেমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষকের জমিতে সেচের সংকট, আর বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খালটি উদ্ধারে তাই মাঠে নেমেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

    গত ৭ জুলাই মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বড়টিয়া ইউনিয়নের ফুলহারা বাজারে জড়ো হয়েছিলেন ফুলহারা, মৌহালী, কলিয়া ও গোলাপনগর গ্রামের মানুষ। তাদের অভিযোগ, কয়েক প্রজন্ম ধরে প্রবাহমান সরকারি খালটি ভরাট করে স্থাপনা ও দোকানপাট নির্মাণের চেষ্টা চলছে। এতে চার গ্রামের তিন ফসলি জমির চাষাবাদ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

    ফুলহারা খাল পুনরুদ্ধারের দাবিতে একজোট হয়েছে স্থানীয় গ্রামবাসী
    ফুলহারা খাল পুনরুদ্ধারের দাবিতে একজোট হয়েছে স্থানীয় গ্রামবাসীছবি: সারাক্ষণ সংবাদ
     

    অভিযোগটি অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ২৯ এপ্রিলও একই এলাকায় খালের সরকারি জমি উদ্ধারের দাবিতে অবস্থান নিয়েছিলেন স্থানীয়রা। তখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে খালের সীমানা পরিমাপ ও মানচিত্র যাচাই করে সরকারি জমিতে অবৈধ দখল প্রমাণিত হলে উচ্ছেদ অভিযানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় খালে সরকারি জমি কতটুকু? কোথায় তার সীমানা? কার দখলে রয়েছে? আর দখল হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধান শুরু করে রাইজিংবিডি। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে আরও বড় এক চিত্র।

    ঘিওর উপজেলায় সরকারি খাসজমির পরিমাণ ১ হাজার ৫৩৬ দশমিক ২০ একর। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ খাসজমির কোন অংশ কোথায়, কোন দাগ ও খতিয়ানে রয়েছে, গত পাঁচ বছরে কারা বন্দোবস্ত পেয়েছেন, কোথায় অবৈধ দখল রয়েছে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব তথ্য জানতে উপজেলার একাধিক ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও খাসজমির কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে এ প্রতিবেদক এসব খাসজমির তথ্য জানতে ঘিওর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন।

    নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও উপজেলা ভূমি অফিস থেকে কোনো তথ্য বা লিখিত সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় গত ২ আগস্ট মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে তথ্য অধিকার আইনের ২৪ ধারায় আপিল করেন তিনি। আপিলের পর ঘিওর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে লিখিত জবাব দেওয়া হয়।

    জবাবের ওই নথি বলছে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তানভীর ইসলাম স্বাক্ষরিত জবাবে ঘিওর উপজেলায় মোট খাসজমির পরিমাণ ১,৫৩৬ দশমিক ২০ একর উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আবেদনকারী যে মৌজা, খতিয়ান, দাগ নম্বর, শ্রেণিভিত্তিক বিবরণ এবং নকশাসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়েছিলেন তা দেওয়া হয়নি।

    এর পরিবর্তে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। ১ হাজার ৫৩৬ একরেরও বেশি সরকারি খাসজমি কোন কোন মৌজায় ছড়িয়ে আছে, কোন দাগে কত জমি রয়েছে, কোন জমি খাল, নদী, পুকুর বা কৃষিজমি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত এবং এসব জমির বর্তমান দখল পরিস্থিতি কী তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রদান করেননি।

    গত পাঁচ বছরে কারা খাসজমি বন্দোবস্ত পেয়েছেন, বন্দোবস্তের নীতিমালা কী, বর্তমানে কোন খাসজমি অবৈধভাবে দখলে রয়েছে, দখলদার কারা, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, গত পাঁচ বছরে কতটি উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে, খাসজমি নিয়ে কতটি অভিযোগ বা বিরোধ রয়েছে এবং সেখান থেকে কত রাজস্ব আদায় হয়েছে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসবের ক্ষেত্রে লিখিত জবাবে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর ধারা ৭ এবং তথ্য অধিকার বিধিমালা ২০০৯ এর বিধি ৫ এর উল্লেখ করে তথ্য দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে।

    তথ্য অধিকার আইনের ৭ ধারায় প্রকাশে বাধ্য নয় এমন তথ্যের মধ্যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব, পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তাসহ আইনে নির্দিষ্ট বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। একই সঙ্গে আইনের ৯(৯) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অনুরোধের একটি অংশ প্রকাশযোগ্য না হলেও যুক্তিসঙ্গতভাবে পৃথক করা সম্ভব হলে প্রকাশযোগ্য অংশ সরবরাহ করতে হবে। ঘিওরের খাসজমি বন্দোবস্ত, সরকারি জমির দখল, উচ্ছেদ অভিযান, অভিযোগ ও রাজস্ব সংক্রান্ত চাওয়া তথ্যের কোন অংশ ধারা ৭ অনুযায়ী কেন তথ্য দেওয়া সম্ভব নয় জবাবে তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

    তথ্য অধিকার আইন বিশেষজ্ঞ হামিদুর রহমান হিল্লোল বলেন, সরকারি খাসজমির পরিমাণ, অবস্থান, বন্দোবস্ত ও দখল সংক্রান্ত তথ্য সাধারণভাবে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য। শুধু তথ্য অধিকার আইনের ৭ ধারা উল্লেখ করলেই হবে না; চাওয়া তথ্যের কোন অংশ আইনের কোন উপধারার আওতায় প্রকাশযোগ্য নয়, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে। কোনো তথ্যের একটি অংশ প্রকাশে বাধা থাকলেও প্রকাশযোগ্য অংশ আলাদা করে দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে খাসজমির মতো জনসম্পদ ব্যবস্থাপনার তথ্য না দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে আইনের নির্দিষ্ট বিধান ও যৌক্তিকতা স্পষ্ট করতে হবে।

    সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ইন্তাজ উদ্দিন বলেন, সরকারি খাসজমি রাষ্ট্রের সম্পদ, তাই এসব জমির সঠিক হিসাব ও বর্তমান দখল পরিস্থিতি প্রশাসনের কাছে সংরক্ষিত থাকা উচিত। কোন জমি কোথায় রয়েছে, কারা বন্দোবস্ত পেয়েছেন বা কোথাও অবৈধ দখল থাকলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব তথ্য জনগণের জানার সুযোগ থাকা দরকার। প্রশাসনের কাছে তথ্য না থাকা বা তথ্য চেয়ে আবেদন করার পরও পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়া হলে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

    ঘিওর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানভীর ইসলাম বলেন, ফুলহারা খাল দখল করে স্থাপনা নির্মানের অভিযোগে চারজনকে নোটিশ করা হয়েছে। এরমধ্যে একজন আপত্তি জানিয়েছেন।

    খাস জমি দখলের পূর্নাঙ্গ তথ্য এ কার্যালয়ে নেই। তাই তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের পরও সরবরাহ করা যায়নি। খাস জমির সকল তথ্য আপনার কার্যালয়ে সংরক্ষণ করার নিয়ম রয়েছে তাহলে কার্যালয়ে নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই।

    মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী খাস জমির দখল উচ্ছেদ পরিচালনা করা হয়।

    কেউ যদি লিখিত অভিযোগ করেন বা কখনও প্রশাসনের নলেজে খাস জমি দখলের তথ্য আসে তখন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সম্প্রতি নদী দখলদারদের তালিকা অনুযায়ী উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করতে চাহিদা পাঠানো হয়েছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ