মানিকগঞ্জের দুই শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও তারাসিমা অ্যাপারেলস লিমিটেড। পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে নদী দূষণ সংক্রান্ত নোটিশ, নমুনা পরীক্ষার ফল এবং পরিবেশগত মানদণ্ড লঙ্ঘনের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে আকিজ টেক্সটাইল মিলসের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানাও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
দূষনের এতো নথিপত্র থাকার পরও ২০২৫ সালে শ্রম মন্ত্রনালয়ের ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।
পুরস্কারের তালিকায় তারাসিমা অ্যাপারেলসকে রেডি মেড গার্মেন্টস ( ওভেন) এবং আকিজ টেক্সটাইল মিলসকে টেক্সটাইল খাতে নির্বাচিত করা হয়। ওই বছর মোট ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ১৬টি শিল্প খাতে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, টেকসই শিল্পচর্চা, জ্বালানি দক্ষতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কর্মক্ষেত্রের মানোন্নয়নের মতো বিষয়কে উৎসাহিত করতে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতে নদী দূষণের অভিযোগ, নমুনা পরীক্ষার ফল, নোটিশ এবং আকিজের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে জরিমানার তথ্য থাকার পরও প্রতিষ্ঠান দুটি কীভাবে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ হিসেবে নির্বাচিত হলো। পুরস্কারের মূল্যায়নের সময় কি কারনে পরিবেশগত তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়নি তা খতিয়ে দেখা উচিত।
তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ধলেশ্বরী নদী দূষণের অভিযোগে আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডকে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৪ সালের ১২ মার্চও প্রতিষ্ঠানটিকে নদী দূষণ সংক্রান্ত বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর আকিজ টেক্সটাইল মিলসের কারখানা পরিদর্শন করে। ওই সময় কারখানার প্রধান নর্দমার নির্গমনমুখ থেকে তরল বর্জ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা গবেষণাগারে নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, এতে রঙের মাত্রা ছিল ৪২২ মিলিগ্রাম/লিটার। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১৫০ মিলিগ্রাম/লিটার। অর্থাৎ পরীক্ষিত নমুনায় রঙের মাত্রা নির্ধারিত সীমার প্রায় তিন গুণ পাওয়া যায়। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ধারা ৭ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২০২৬ সালের ৯ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানিতে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ক্ষতিসাধনের দায়ে আকিজ টেক্সটাইল মিলসকে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা/ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। ১৮ মার্চের মধ্যে ওই অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ অমান্য করলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
আকিজ টেক্সটাইলের বিরুদ্ধে পরিবেশগত অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার একটি দল প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে। সে সময় কারখানা থেকে নির্গত তরল বর্জ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ওই নমুনা পরীক্ষায় দ্রবীভূত অক্সিজেন বা ডিও পাওয়া যায় ০.৮ মিলিগ্রাম/লিটার, রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা সিওডি ২৮৫ মিলিগ্রাম/লিটার এবং জৈব অক্সিজেন চাহিদা বা বিওডি ৭২ মিলিগ্রাম/লিটার।পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে কারণ দর্শানোর এবং শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ জারি করা হয়।
তারাসিমা অ্যাপারেলস লিমিটেডের বিরুদ্ধেও পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতে নদী দূষণ সংক্রান্ত একাধিক পদক্ষেপের তথ্য রয়েছে। ২০২৩ সালের ৩ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির ইটিপি আউটলেট এবং গাজীখালী নদীতে নির্গমনমুখ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। ৪ এপ্রিল পাওয়া পরীক্ষার ফলে সিওডি,বিওডি ও টিডিএস এর মাত্রা নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ৩ মে তারাসিমা লিখিত জবাব দেয়।
২০২৩ সালে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উন্নয়ন সভায় তারাসিমা অ্যাপারেলসের দূষণ নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে নদী দূষণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নোটিশ দেয়। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ দেওয়া আরেক নোটিশে বলা হয়, তারাসিমার ইটিপি থেকে তরল ও স্লাজ বর্জ্যের মাধ্যমে গাজীখালী নদী দূষিত হতে দেখা গেছে। কারখানার স্লাজ বর্জ্য নদীর পানি দূষিত করছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়। নদীর তীর থেকে স্লাজ অপসারণ করে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অবহিত করার পাশাপাশি লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। পরে ২১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি জবাব দেয়।
মানিকগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, ধলেশ্বরী নদীর দূষণ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। নদীর পানি দূষিত হলে কৃষি ও মাছের ওপর এর প্রভাব পড়ে। ধলেশ্বরী নদীর দূষণ বন্ধে আমরা এলাকাবাসীকে নিয়ে একাধিকবার প্রতিবাদ করেছি। আকিজের দূষণের কারণে নদীর মাছ ও কৃষির ওপর প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে তারাসিমার দূষণের কারণে গাজীখালী নদীর পানি সেচের কাজে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দূষণের অভিযোগ ও ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য থাকলে পুরস্কারের মূল্যায়নের সময় তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি কেন তা অনুমান করার কিছু নেই। সহজেই বোঝা যাচ্ছে পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরষ্কার দিতে এসব তথ্য লুকানো হয়েছে। একদিকে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানকে গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে পুরস্কৃত করা হবে এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কি হতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে যদি দূষণের তথ্য থাকে তাহলে কেন সংশ্লিষ্ট পুরস্কার কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হয়নি সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।
রিভারাইন পিপল এর মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, এটা স্পষ্ট যে ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্তও আকিজ টেক্সটাইল মিলস ধলেশ্বরী নদী এবং তারাসিমা অ্যাপারেলস গাজীখালী নদী দূষণ করছিল। তখন পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কারখানা দুটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। আর পরের বছরই ২০২৫ সালে এসে দুই দূষণকারী কারাখানাকে সরকারের পক্ষ থেকে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া বিস্ময়কর। মনে রাখতে হবে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয় সেইসব কারখানাকে যারা পরিবেশ সুরক্ষাবিধি মেনে চলে। এমন কোনও প্রমাণ নেই যে নোটিশ পাওয়ার এক বছরের মধ্যেই কারখানা দুটি নদীদূষণ বন্ধ করেছিল। নদী দূষণ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ খেয়েও যদি গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া যায় তাহলে বাকিরাও নিশ্চয়ই নদী দূষণে আগ্রহী হবে বা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ দুটির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়েছে এই দুই কারখানাকে কারা পুরস্কারের জন্য বাছাই করেছিল অবিলম্বে খতিয়ে দেখা দরকার।
তারাসিমা অ্যাপারেলসের কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা কামরুজ্জামান বলেন, ওই সময়ে নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে জবাব দিয়েছিল। এরপর আর এ ধরনের ফলাফল আসেনি। গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কারখানা পরিদর্শন করেই প্রতিষ্ঠানটিকে নির্বাচিত করেছে। তাঁদের কারখানা সরকারি নিয়মনীতি মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
আকিজ টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপক আরিফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের শুনানিতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, নমুনা কারখানা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং তাদের নিজস্ব পরীক্ষায় দূষণের মাত্রা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল। দূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে আংশিক জেএলডি ও এসটিপি স্থাপন কাজ শেষ হবে।
গ্রীন ফ্যাক্টরী এ্যাওয়ার্ডের বিষয়ে আপনাদের কার্যালয় থেকে কোন তথ্য চাওয়া হয়েছিলো কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোজাফফর খান বলেন, আমাদের সকল তথ্য অধিদপ্তরে পাঠানো থাকে সেখান থেকে নিয়ে থাকতে পারেন।বিষয়টি নিয়ে তেমন কিছু জানিনা, বিষয়টি অধিদপ্তর বা মন্ত্রনালয়ের বিষয়। এ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দূষন ঠেকাতে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে। পরবর্তীতে এনফোর্সন্ট শাখা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
শ্রম মন্ত্রনালয়ের গঠিত পুরস্কারের কোর কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিবেশ-২ অধিশাখা) মুনিরা সুলতানা। তিনি বলেন, কোর কমিটির সর্বশেষ সভাতে গিয়েছিলাম। তার আগে কোন পরিদর্শন বা সভাতে আমি উপস্থিত থাকিনি।
আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও তারাসিমা এ্যাপারেলস লিমিটেড আপনার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী দূষনকারী প্রতিষ্ঠান হয়েও কিভাবে গ্রীন ফ্যাক্টরী সনদ পেলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিটিতে যারা ছিলেন তারাই সব করেছেন। শেষ সভাতে গিয়ে কিছু করা যায়না।
পরিবেশ অধিদপ্তর সংক্রান্ত বিষয়ে আপনি ছাড়া তো ওই কমিটিতে আর কেউ ছিলোনা ,আপনি তো মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তর থেকেও কোন নথি তলব করেননি এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি সাময়িক সময় ওই দপ্তরে দায়িত্ব ছিলাম। এ নিয়ে বেশি কিছু করা যায়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের আরো একজন ছিলেন তিনি বলতে পারবেন।
মুনিরা সুলতানার কথার সূত্র ধরে মূল্যায়ন কমিটিতে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: আখতারুজ্জামান টুকুর সাথে যোগাযোগ করা হয় । আখতারুজ্জামান টুকু জানান, এমন কোন কমিটিতে তিনি ছিলেন না। কেউ হয়তো ভুলে তার নাম দিয়েছে, কারন তিনি ২০২৪ সালে চাকরি থেকে অবসরে গেছেন।
বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমানকে জানানো হলে তিনি বলেন, এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।





