শিরোনাম
Advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

খাস জমির তথ্য লুকাতে সিংগাইর এসিল্যান্ডের দ্বিমুখী চাল

Advertisement
সিংগাইরের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. হাবেল উদ্দিনছবি: সারাক্ষণ সংবাদ

    সরকারি খাস জমির তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. হাবেল উদ্দিন। এক চিঠিতে আবেদনকারীর চাহিত ‘সকল তথ্য’ সরকারি ওয়েবসাইটে রয়েছে বলে জানানো হলেও মাত্র ১৮ দিন পর জেলা প্রশাসকের কাছে করা আপিলের জবাবে একই তথ্যের কিছু অংশকে ‘গোপনযোগ্য’ ও ‘আদালতে বিচারাধীন’ উল্লেখ করে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। আবার অবৈধ দখলদার ও উচ্ছেদ অভিযান-সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘এই মুহূর্তে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।’ দুটি সরকারি চিঠির বক্তব্য পর্যালোচনায় একই তথ্যের বিষয়ে ভূমি অফিসের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান সামনে এসেছে। এ ঘটনায় আপিলের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এখন তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আবেদনকারী।

      গত ৩ জুন ২০২৬ তারিখে সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন জাহিদুল হক চন্দন। আবেদনে উপজেলার মোট খাস জমির পরিমাণ, দাগ ও খতিয়ানের তালিকা, গত পাঁচ বছরে খাস জমি বন্দোবস্তপ্রাপ্তদের তালিকা, অবৈধ দখলদারদের তথ্য এবং খাস জমি উদ্ধারে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের বিবরণসহ আটটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। আবেদনের ২৫ দিন পর গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে স্মারক নম্বর-৯০৪-এর মাধ্যমে জবাব দেন এসিল্যান্ড মো. হাবিল উদ্দিন। ওই চিঠিতে বলা হয়, আবেদনকারীর চাহিত সকল তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা সিংগাইর উপজেলা ভূমি অফিসের সরকারি ওয়েবসাইটে রয়েছে। আবেদনকারীকে ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ওয়েবসাইটে চাহিত খাস জমির দাগ-খতিয়ান, বন্দোবস্তপ্রাপ্তদের তালিকা, অবৈধ দখলদার কিংবা উচ্ছেদ অভিযানের প্রয়োজনীয় তথ্য না পেয়ে এই প্রতিবেদক গত ৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করেন।

        আপিলের পর গত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত জবাব দেন এসিল্যান্ড। স্মারক নম্বর-১০০৩ এর ওই জবাবেই প্রথম চিঠির সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। ২৮ জুনের চিঠিতে যে তথ্যগুলোকে ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছিল, আপিলের জবাবে সেগুলোর কিছু অংশকে তথ্য অধিকার আইনের বিভিন্ন ধারা ও উপধারার আওতায় ‘গোপনযোগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে খাস জমি-সংক্রান্ত আদালতে মামলা চলমান থাকার কথাও বলা হয়।

          তথ্য অধিকার আইন বিশেষজ্ঞ হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে একই তথ্যের অবস্থান কীভাবে বদলে গেল? সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য রয়েছে বলে আবেদনকারীকে সেখানে পাঠানোর পর আপিলের জবাবে সেই তথ্যই আবার গোপনীয় দাবি করা হলে বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, একই আবেদনের ক্ষেত্রে একদিকে ‘সকল তথ্য ওয়েবসাইটে রয়েছে’ বলা হচ্ছে, অন্যদিকে কিছু তথ্য ‘গোপনযোগ্য’ এবং কিছু তথ্য ‘পাওয়া যায় না’ বলা হচ্ছে। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী সরকারি জবাব তথ্য অধিকার আইনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

        সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, খাস জমি কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পদ এবং জনগণের সম্পদ। এসব জমির পরিমাণ, দাগ-খতিয়ান, বন্দোবস্ত ও দখলসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা উচিত। কোনো সরকারি দপ্তর তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন অবস্থান নিতে পারে না, যাতে একজন নাগরিক প্রথমে এক ধরনের জবাব পান, পরে আপিল করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। খাস জমি বন্দোবস্ত ও অবৈধ দখলের তথ্য গোপন থাকার সুযোগ থাকলে সেখানে অনিয়ম, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা নেওয়া কিংবা সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে।

          সিংগাইর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো:হাবেল উদ্দিন সম্প্রতি বদলি হয়েছেন। মুঠেফোনে যোগাযোগ করে একই আবেদনে দুই রকম জবাব দেওয়া হলো কেন এমন বিষয় জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো:হাবেল উদ্দিন বলেন, এ আবেদনের বিষয়ে যথাযথভাবে জবাব দেওয়া হয়েছে। আপিল শুনানিতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। বিষয়টি আপিল কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করেছেন।

        জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী কেউ যথাযথভাবে আবেদন করলে তার তথ্য বাধ্যতামূলক প্রদান করতে হবে। আইনে যেসকল তথ্য দেওয়া যাবে না তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রদানযোগ্য তথ্য প্রদান না করলে তথ্য অধিকার আইনে কমিশনে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। সিংগাইরের তথ্য প্রদানের বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে দেখবো।

এ বিভাগের আরও সংবাদ