শিরোনাম
Advertisement
ভ্রমণ

ক্লাইড নদীর বুকে ইতিহাস বহন করছে ‘দ্য টল শিপ গ্লেনলি’

Advertisement
ছবি: সংগৃহীত

    স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরের ক্লাইড নদীর তীরে অবস্থিত রিভারসাইড মিউজিয়ামের পাশে নোঙর করে আছে এক ঐতিহাসিক পালতোলা জাহাজ। নাম ‘দ্য টল শিপ গ্লেনলি’ (The Tall Ship Glenlee)। এটি শুধু একটি জাহাজ নয়, বরং ব্রিটিশ সামুদ্রিক ইতিহাস, বিশ্ব বাণিজ্য এবং স্কটল্যান্ডের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের এক জীবন্ত সাক্ষী।

১৮৯৬ সালের ৩ ডিসেম্বর স্কটল্যান্ডের পোর্ট গ্লাসগোর অ্যান্ডারসন রজার অ্যান্ড কোম্পানির বে শিপইয়ার্ডে জাহাজটি নির্মিত হয়। সে সময় ক্লাইড নদীর তীর ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র। স্টিলের তৈরি তিন মাস্তুলবিশিষ্ট এই বার্ক ছিল উনিশ শতকের শেষ দিকের আধুনিক মালবাহী পালতোলা জাহাজগুলোর অন্যতম। প্রায় ৯৫ মিটার দীর্ঘ এই জাহাজে কোনো ইঞ্জিন ছিল না। সম্পূর্ণ বাতাসের শক্তিতেই এটি মহাসাগর পাড়ি দিত।

    নির্মাণের পর গ্লেনলি প্রথম যাত্রায় কেপ হর্ন ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে পৌঁছায়। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গম, কয়লা, নাইট্রেট, কেরোসিনসহ নানা ধরনের পণ্য পরিবহন করে। জাহাজটি চারবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে এবং বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সমুদ্রপথ কেপ হর্ন ১৫ বার অতিক্রম করে, যা আজও নাবিকদের কাছে এক অসাধারণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

দীর্ঘ পথচলায় জাহাজটির মালিকানা ও নাম একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৮৯৮ সালে এটি ‘ইসলামাউন্ট’ নামে পরিচিত হয়। পরে ১৯১৯ সালে ইতালীয় মালিকানায় এর নাম হয় ‘ক্লারাস্টেলা’। ১৯২২ সালে স্পেনের নৌবাহিনী জাহাজটি কিনে ‘গালাতেয়া’ নাম দেয় এবং এটিকে নৌ ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ জাহাজে রূপান্তরিত করে। জাহাজে শত শত ক্যাডেটের থাকার ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, পানির ট্যাংক, জেনারেটর ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত করা হয়। প্রায় চার দশক ধরে স্পেনের হাজার হাজার নৌ কর্মকর্তা ও ক্যাডেট এই জাহাজে প্রশিক্ষণ নেন।

    ১৯৬২ সালে জাহাজটি অবসর নেয়। পরে এটি স্পেনের সেভিলে দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। একসময় এটি ডুবে যায়, অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় এবং ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, গ্লেনলির ইতিহাস সেখানেই শেষ হয়ে গেছে।

১৯৯২ সালে ক্লাইড মেরিটাইম ট্রাস্ট নিলামে জাহাজটি কিনে স্কটল্যান্ডে ফিরিয়ে আনে। এরপর প্রায় ছয় বছর ধরে চলে ব্যাপক সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজ। ১৯৯৯ সালে ঐতিহাসিক জাহাজটি আবার জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ২০১১ সালে নতুন রিভারসাইড মিউজিয়াম উদ্বোধনের পর ক্লাইড নদীর তীরে বিশেষভাবে নির্মিত ঘাটে এটিকে স্থায়ীভাবে নোঙর করা হয়।

    বর্তমানে গ্লেনলি একটি ভাসমান জাদুঘর। দর্শনার্থীরা জাহাজের ক্যাপ্টেনের কেবিন, নাবিকদের থাকার জায়গা, কার্গো হোল্ড, রান্নাঘর, ডেক এবং মাস্তুলের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখতে পারেন। এখানে উনিশ ও বিশ শতকের নাবিকদের জীবনযাত্রা, বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাস এবং ক্লাইড নদীকেন্দ্রিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পের নানা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

বিশ্বে এ ধরনের মাত্র পাঁচটি ক্লাইড নির্মিত বার্ক এখনো ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাজ্যে গ্লেনলিই একমাত্র টিকে থাকা জাহাজ। এ কারণে এটি স্কটল্যান্ডের সামুদ্রিক ঐতিহ্যের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত। জাহাজটি ন্যাশনাল হিস্টোরিক ফ্লিটের অন্তর্ভুক্ত এবং ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জাহাজ সংরক্ষণ তালিকায় নিবন্ধিত।

    গ্লাসগো ভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য রিভারসাইড মিউজিয়াম এবং গ্লেনলি একে অপরের পরিপূরক। আধুনিক স্থাপত্যের জাদুঘরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ১৩০ বছরের এই ঐতিহাসিক জাহাজ যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, এক সময় ক্লাইড নদী ছিল বিশ্বের জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্র বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। গ্লেনলি সেই গৌরবময় ইতিহাসেরই এক জীবন্ত স্মারক।

    সূত্র : রাইজিংবিডি

এ বিভাগের আরও সংবাদ