শিরোনাম
Advertisement
ভ্রমণ

ইতিহাস, স্থাপত্য আর আজানের সুরে অনন্য ‘মসজিদের নগরী’

Advertisement
মসজিদের নগরী তুরস্কসংগৃহীত

    ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা ইস্তাম্বুল শুধু তুরস্কের বৃহত্তম শহর নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নগরী। এশিয়া ও ইউরোপ দুই মহাদেশকে এক সুতোয় গেঁথে রাখা এই শহর হাজার বছরের ইতিহাস, সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং অনন্য স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিশ্বের খুব কম শহরই আছে, যেখানে বাইজেন্টাইন ও উসমানীয় সভ্যতার উত্তরাধিকার এবং হাজারো মসজিদের মিনার একসঙ্গে দেখা যায়। তাই ইস্তাম্বুলকে ‘মসজিদের নগরী’ বলা হয়।

শহরটিতে পা রাখার পর থেকেই বোঝা যায়, কেন এই নামটি এত জনপ্রিয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইস্তাম্বুল যেন ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের এক অনবদ্য সহাবস্থান। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই চারদিক থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। সেই সুরের সঙ্গে আকাশরেখায় সারি সারি মসজিদের মিনার ও গম্বুজ এক অনন্য আবহ তৈরি করে। আধুনিক অট্টালিকা, ব্যস্ত সড়ক, ট্রাম, মেট্রো ও পর্যটকদের ভিড়ের মাঝেও শহরটি তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেছে।

    ইস্তাম্বুলের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের। প্রাচীন বাইজেন্টিয়াম, পরে কনস্টান্টিনোপল এবং বর্তমানে ইস্তাম্বুল নামে পরিচিত এই শহর ছিল রোমান, বাইজেন্টাইন ও উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী।

১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের বিজয়ের পর শুরু হয় উসমানীয় স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ। পরবর্তী দুই শতকে নির্মিত হয় অসংখ্য রাজকীয় মসজিদ, মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার, হাম্মাম, বাজার ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনা। এসব স্থাপত্যই আজকের ইস্তাম্বুলকে বিশ্বের অন্যতম ইসলামি ঐতিহ্যের নগরীতে পরিণত করেছে।

    ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ইস্তাম্বুলে বর্তমানে তিন হাজারেরও বেশি মসজিদ রয়েছে। ছোট মহল্লার মসজিদ থেকে শুরু করে রাজকীয় স্থাপত্যের বিশাল মসজিদ প্রতিটি স্থাপনাই শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো পর্যটক, গবেষক ও স্থাপত্যপ্রেমী প্রতি বছর ইস্তাম্বুলে ছুটে আসেন।

শহরের গুরুত্ব বিবেচনায় ইউনেস্কো ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক এলাকাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

    ইস্তাম্বুলের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন সুলেমানিয়ে মসজিদ। শহরের ঐতিহাসিক সাত পাহাড়ের একটির ওপর নির্মিত এই মসজিদ দূর থেকেই নজর কেড়ে নেয়। বিশাল কেন্দ্রীয় গম্বুজ, চারটি সুউচ্চ মিনার এবং ধাপে ধাপে সাজানো ছোট ছোট গম্বুজ এর স্থাপত্যকে করেছে অনন্য। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মসজিদের অবয়ব স্পষ্ট দেখা যায়, যা ইস্তাম্বুলের স্কাইলাইনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক।

১৫৫০ থেকে ১৫৫৭ সালের মধ্যে উসমানীয় সাম্রাজ্যের শক্তিশালী শাসক সুলতান প্রথম সুলেমানের নির্দেশে নির্মিত হয় এই মসজিদ। এর নকশা করেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের কিংবদন্তি স্থপতি মিমার সিনান, যিনি ইসলামি স্থাপত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থপতি হিসেবে স্বীকৃত। শুধু নামাজের স্থান নয়, সুলেমানিয়ে ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক কমপ্লেক্স। এখানে ছিল মাদ্রাসা, হাসপাতাল, পাঠাগার, রান্নাঘর, অতিথিশালা ও দরিদ্র মানুষের জন্য বিভিন্ন সেবাকেন্দ্র।

    মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি, সূক্ষ্ম অলংকরণ, প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের নিখুঁত ব্যবস্থা এবং এমন শব্দপ্রকৌশল, যা কয়েক শতাব্দী আগেই স্থাপত্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একাধিক ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরও মসজিদটি আজও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যা মিমার সিনানের প্রকৌশল দক্ষতার অসাধারণ প্রমাণ।

    সুলেমানিয়ে ছাড়াও ইস্তাম্বুলের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হায়া সোফিয়া, সুলতান আহমেদ বা ব্লু মসজিদ, ফাতিহ মসজিদ, ইয়েনি মসজিদ, অরতাকয় মসজিদ, রুস্তম পাশা মসজিদসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। হায়া সোফিয়া একসময় ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গির্জা, পরে তা মসজিদে রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে ব্লু মসজিদ তার ছয়টি মিনার ও নীল ইজনিক টাইলসের জন্য বিশ্বজুড়ে সমানভাবে সমাদৃত।

    আজকের ইস্তাম্বুল শুধু অতীতের স্মৃতি ধারণ করে নেই, বরং আধুনিক তুরস্কের অর্থনীতি, পর্যটন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মসজিদগুলোতে ইবাদতের পাশাপাশি ইতিহাস জানতে, স্থাপত্য উপভোগ করতে এবং এই শহরের আত্মাকে অনুভব করতে আসেন।

    সূত্র : রাইজিংবিডি

এ বিভাগের আরও সংবাদ