ব্রণের উপদ্রব কমানো এবং বয়সের ছাপ বা অকাল বার্ধক্যের বলিরেখা দূর করতে আধুনিক স্কিনকেয়ার বা রূপচর্চার বাজারে আলোচিত ও ব্যবহৃত উপাদানের নাম রেটিনয়েড।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি মূলত ভিটামিন-এ থেকে তৈরি এক শক্তিশালী ওষুধ বা ‘কেমিক্যাল কম্পাউন্ড’।
রেটিনয়েড ত্বকের উপরিভাগের মৃত কোষগুলোকে দ্রুত ঝরিয়ে ফেলে মস্তিস্কের সংকেতে নতুন ও সতেজ কোষ তৈরির গতি বাড়িয়ে দেয়। তবে এই উপাদান অত্যন্ত সক্রিয় ও কড়া হওয়ায়, এর সঠিক ব্যবহার ও ‘লেয়ারিং’য়ের নিয়ম না জানলে ত্বক পুড়ে যাওয়া বা স্থায়ী অ্যালার্জির মতো মারাত্মক চিকিৎসাগত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-বিষয়ক পোর্টাল ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের বোর্ড-প্রত্যয়িত ডার্মাটোলজিস্ট ডা. সুসান বার্ড বলেন, “রেটিনয়েড ব্যবহারের সময় কিছু কড়া প্রসাধনী বর্জন করা বাধ্যতামূলক। আর এটা জানা জরুরি।”
রেটিনয়েড আসলে কী কী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়?
ডা. সুসান বার্ড জানান, রেটিনয়েড কেবল সাধারণ সৌন্দর্য বর্ধনকারী ক্রিম নয়; এটি বেশ কিছু গুরুতর চর্মরোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকদের প্রথম পছন্দ।
অ্যাকনি ভালগারিস: লোমকূপের গোড়ায় অতিরিক্ত তেল ও মৃত কোষ জমে যখন ব্যাকটেরিয়ার তীব্র সংক্রমণ ঘটে, তখন রেটিনয়েড লোমকূপের জ্যাম দূর করে ব্রণ দূর করে।
সোরিয়াসিস ও ফটোএইজিং: এটি ত্বকের অতিরিক্ত কোষের বৃদ্ধি ধীর করে সোরিয়াসিসের লালচে র্যাশ কমায়। পাশাপাশি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে হওয়া ফটোএইজিং বা বলিরেখা ও খসখসে চামড়া দূর করে টানটান-ভাব ফিরিয়ে আনে।
বিরল স্কিন ক্যানসার: ওরাল বা মুখে খাওয়ার রেটিনয়েড ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি থামিয়ে ‘কিউটেনিয়াস টি-সেল লিম্ফোমা’ এবং ‘ক্যাপোসি সারকোমা’র মতো বিরল ত্বকের ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
রেটিনয়েডের প্রধান ধরন ও কাজ করার সময়কাল
বাজারে ওরাল (মুখে খাওয়ার) এবং টপিক্যাল (ত্বকে মাখার) দুই ধরনের রেটিনয়েড পাওয়া যায়। এর মধ্যে ‘অ্যাডাপালিন’ হল একমাত্র রেটিনয়েড, যা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া সরাসরি কেনা যায়।
তীব্র সিস্টিক ব্রণের জন্য চিকিৎসকেরা মুখে খাওয়ার ‘অ্যাকুটেন’ প্রেসক্রাইব করে থাকেন চিকিৎসকরা।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “ব্রণের উন্নতি দেখতে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় লাগলেও, মুখের চামড়ার বলিরেখা ও গঠন নিখুঁত করতে রেটিনয়েডের একটানা ন্যূনতম ৩ থেকে ৬ মাস সময় লেগে থাকে।”
রেটিনয়েড ব্যবহারের সময় বর্জনীয় ৩টি কড়া প্রসাধনী
চিকিৎসা-বিজ্ঞান ও চর্মরোগবিদ্যার নির্দেশিকা অনুযায়ী, রেটিনয়েডের সঙ্গে নিচে উল্লেখিত ৩টি কেমিক্যাল মাখলে একে অপরের কার্যকারিতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং কেমিক্যাল বার্ন বা তীব্র চামড়া ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ভিটামিন সি: ভিটামিন-সি একটি ত্বক উজ্জ্বলকারী উপাদান। রেটিনয়েড ও ভিটামিন-সি একসঙ্গে মাখলে দুটি উপাদানই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
তাই চর্মরোগ-বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হল, ভিটামিন-সি সকালে মাখতে হবে এবং রেটিনয়েড কেবল রাতে মাখতে হবে।
বেনজোইল পারক্সাইড: এই দুই উপাদানই ব্রণের জীবাণু মারতে কাজ করে। একসঙ্গে মেখে ‘লেয়ারিং’ করলে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক ও কালচে হয়ে যায়। এর বিপরীতে, বেনজোইল পারক্সাইড সকালে এবং রেটিনয়েড রাতে ব্যবহার করতে হবে।
এএইচএ এবং বিএইচএ: গ্লাইকোলিক বা স্যালিসিলিক অ্যাসিডের মতো কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্টগুলো রেটিনয়েডের সঙ্গে একই রাতে মাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এগুলো আলাদা আলাদা দিনে ব্যবহার করা অথবা এক্সফোলিয়েন্ট সকালে এবং রেটিনয়েড রাতে মাখা নিরাপদ।
নিরাপদ নির্দেশিকা
রাতের রুটিন ও সানস্ক্রিন: রেটিনয়েড ত্বককে রোদের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল করে তোলে, তাই এটি কেবল রাতে মাখতে হবে এবং পরের দিন সকালে বাইরে বের হওয়ার আগে এসপিএফ ৩০ সানস্ক্রিন মাখা বাধ্যতামূলক।
ধীরে ধীরে শুরু করা: প্রথমবার ব্যবহারের সময় সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ দিন অল্প করে মেখে ত্বকের সহ্য ক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে, শুরুতে ব্রণ সাময়িক একটু বাড়তে পারে যা স্বাভাবিক।
চোখ ও মুখের কোণ বর্জন: ক্রিম মাখার সময় চোখ, কান, ঠোঁট এবং নাকের দুই কোণের সংবেদনশীল অংশ থেকে প্রসাধনী দূরে রাখা বৈজ্ঞানিক নিয়ম।
গর্ভবতী নারীদের কড়া নিষেধাজ্ঞা: গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য রেটিনয়েড ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ এটি ভ্রূণের মারাত্মক জন্মগত বিকৃতি ঘটাতে পারে।
সূত্র : বিডিনিউজ